যে কোন সমস্যা প্রযুক্তির যুগে নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের প্রস্তুতি
মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু ,
অ্যাডভোকেট , বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর , চট্টগ্রাম
আইন পেশা এমন একটি পেশা, যার সঙ্গে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, সম্পদ, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আইন পেশার ধরন ও কাজের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে, এটাই স্বাভাবিক। একসময় একজন আইনজীবীর প্রধান অবলম্বন ছিল আইনগ্রন্থ, ল’ রিপোর্ট, নোটবুক এবং আদালতের অভিজ্ঞতা। আজ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার, অনলাইন আইনভাণ্ডার, ডিজিটাল কজলিস্ট, ই-ফাইলিং, ভিডিও কনফারেন্স, ডেটাবেজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI)।
প্রযুক্তি এখন আর আইনজীবীর ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়। এটি বর্তমানের বাস্তবতা। আগামী দিনের আইনজীবীকে তাই শুধু আইনের ছাত্র হলে চলবে না, তাকে প্রযুক্তি-সচেতন আইনজীবীও হতে হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। প্রযুক্তি কখনো একজন আইনজীবীর বিকল্প হতে পারে না। প্রযুক্তি একজন আইনজীবীর কাজকে দ্রুত, সহজ ও অধিকতর সংগঠিত করতে পারে, কিন্তু একজন দক্ষ আইনজীবীর বিচারবোধ, নৈতিকতা, অভিজ্ঞতা, যুক্তি বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং আদালতে সঠিক মুহূর্তে সঠিক বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতের সফল আইনজীবী হবেন তিনি, যিনি আইনের জ্ঞান ও প্রযুক্তির সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারবেন।
পরিবর্তিত সময়, পরিবর্তিত আইন পেশা
আমরা এমন একটি সময়ে প্রবেশ করেছি, যখন একটি মামলার প্রস্তুতির জন্য শুধু লাইব্রেরির তাক থেকে বই নামিয়ে পড়াই যথেষ্ট নয়। একজন আইনজীবীকে এখন মুহূর্তের মধ্যে কোনো আইনের সর্বশেষ সংশোধনী, উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, কোনো নির্দিষ্ট ধারার ব্যাখ্যা কিংবা একই বিষয়ে বিভিন্ন রায়ের অবস্থান খুঁজে বের করতে হয়।
আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় খুঁজে পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল’ রিপোর্ট ঘাঁটতে হতো। এখন সঠিক তথ্যভাণ্ডার ও সার্চ কৌশল জানা থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাথমিক অনুসন্ধান করা সম্ভব। আদালতের Cause List, মামলার তারিখ, আদেশের তথ্য, বিভিন্ন আইন ও রায়ের অনলাইন সংস্করণও এখন অনেক সহজলভ্য।
কিন্তু এখানেই নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। তথ্য পাওয়া আর আইন জানা এক বিষয় নয়।
ইন্টারনেট থেকে কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ; কিন্তু সেটি সঠিক কি না, প্রযোজ্য কি না, বর্তমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং আদালতে সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেটিই একজন আইনজীবীর প্রকৃত দক্ষতার পরীক্ষা।
AI: সহকারী, বিকল্প নয়
Artificial Intelligence বা AI আইন পেশায় নতুন একটি দিগন্ত খুলে দিয়েছে। একটি দীর্ঘ নথির সারাংশ তৈরি করা, কোনো বিষয়ে প্রাথমিক গবেষণার কাঠামো তৈরি করা, সম্ভাব্য আইনি প্রশ্ন চিহ্নিত করা, বিভিন্ন যুক্তির তুলনা করা কিংবা একটি খসড়ার ভাষাগত উন্নয়নে AI সহায়ক হতে পারে। কিন্তু একজন তরুণ আইনজীবীর মনে রাখতে হবে, AI যা বলছে সেটিই আইন নয়।
AI কখনো ভুল তথ্য দিতে পারে, অস্তিত্বহীন মামলা বা ভুল citation উল্লেখ করতে পারে, পুরোনো আইনকে বর্তমান আইন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে অথবা একটি রায়ের বক্তব্যকে এমনভাবে সংক্ষেপ করতে পারে, যাতে তার প্রকৃত ratio decidendi-ই পরিবর্তিত হয়ে যায় সুতরাং AI-এর কাছ থেকে পাওয়া কোনো তথ্য আদালতে উপস্থাপনের আগে অবশ্যই মূল আইন, মূল রায় ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করতে হবে।
আমার দৃষ্টিতে, AI-কে একজন “Junior Research Assistant” হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু “Final Authority” হিসেবে নয়। আইনজীবীর নিজের মেধা, বিচারবোধ ও দায়িত্ববোধের জায়গাটি কোনো প্রযুক্তির কাছে সমর্পণ করা যাবে না। নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দক্ষতা: Legal Research। আগামী দিনের আইনজীবীদের জন্য Legal Research বা আইনি গবেষণার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একজন ভালো আইনজীবী শুধু জানবেন না যে, “এই বিষয়ে কোন আইন আছে।” তিনি জানতে চাইবেন:
কোন ধারাটি প্রযোজ্য?
সেই ধারার উপাদান কী?
এর ব্যতিক্রম কী?
সর্বশেষ সংশোধনী কী?
উচ্চ আদালত এই ধারাটি কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন?
একই বিষয়ে বিপরীত কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না?
বর্তমান মামলার facts-এর সঙ্গে পূর্ববর্তী মামলার facts-এর মিল বা অমিল কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার ক্ষমতাই একজন আইনজীবীকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে।
তাই আইন শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য আইন পড়লে হবে না। আইন খুঁজে বের করা, আইন পড়া, আইন বোঝা এবং সেই আইনকে facts-এর সঙ্গে প্রয়োগ করা শিখতে হবে।
Technology Literacy এখন পেশাগত যোগ্যতার অংশ
ভবিষ্যতের একজন আইনজীবীর জন্য কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মৌলিক জ্ঞান কোনো অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়, বরং পেশাগত প্রয়োজনীয়তা।
Word processing, PDF management, document formatting, digital filing, online research, spreadsheet-এর মৌলিক ব্যবহার, secure cloud storage, electronic communication এবং digital case management সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত।
একজন আইনজীবী যদি নিজের গুরুত্বপূর্ণ নথি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারেন, কোনো ফাইলের version নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন অথবা প্রয়োজনের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ document দ্রুত খুঁজে না পান, তাহলে প্রযুক্তির যুগে তার পেশাগত দক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
Cyber Security: যে বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না
আইনজীবীর কাছে মক্কেলের তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। মামলার কাগজপত্র, ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক নথি, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা কিংবা কৌশলগত আইনি পরামর্শ যদি অসতর্কতার কারণে অন্যের হাতে চলে যায়, তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
তাই নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের password security, two-factor authentication, device security, phishing email শনাক্তকরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির নিরাপদ backup সম্পর্কে সচেতন হতে হবে একজন আইনজীবীর chamber-এর দরজা যেমন নিরাপদ রাখতে হয়, তেমনি তার digital chamber-ও নিরাপদ রাখতে হবে।
প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতা যেন হারিয়ে না যায়
প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি আমাদের সময় বাঁচায়। কিন্তু প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও এখানেই। আমরা যদি সবকিছুকে শুধু data, document এবং file হিসেবে দেখতে শুরু করি, তাহলে আইন পেশার মানবিক দিকটি হারিয়ে যেতে পারে।
একজন বিচারপ্রার্থী আদালতে শুধু একটি মামলা নিয়ে আসেন না। তিনি নিয়ে আসেন তার কষ্ট, ভয়, প্রত্যাশা এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা।
একজন আইনজীবীকে তাই মক্কেলের সঙ্গে কথা বলতে জানতে হবে, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় তাকে সত্য কথাটি বলতে হবে, যদিও সেই সত্যটি সবসময় মক্কেলের পছন্দের নাও হতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের কাজের গতি বাড়াবে, কিন্তু মানবিকতা আমাদের পেশার মর্যাদা রক্ষা করবে।
Courtroom Advocacy-এর বিকল্প নেই
নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। Google, online database বা AI দিয়ে যত ভালো research-ই করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আদালতে দাঁড়িয়ে সেই আইন ও যুক্তি উপস্থাপন করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। একটি judgment পড়া এবং সেই judgment-এর ratio আদালতে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা এক জিনিস নয়। কোন facts আদালতের সামনে গুরুত্বপূর্ণ, কোন point প্রথমে বলতে হবে, বিচারকের প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিতে হবে, কখন কোনো যুক্তি পরিত্যাগ করে মূল বিষয়ে ফিরে আসতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, কখন একটি মাত্র authority যথেষ্ট এবং কখন একাধিক authority প্রয়োজন, এসব বই পড়ে পুরোপুরি শেখা যায় না।
এসব শেখা যায় আদালতে বসে, সিনিয়রদের শুনে, নিজের ভুল থেকে এবং বছরের পর বছর পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
তাই নতুন প্রজন্মকে বলব, প্রযুক্তি ব্যবহার করুন, কিন্তু আদালত থেকে দূরে থাকবেন না। Courtroom-ই একজন litigation lawyer-এর প্রকৃত শিক্ষাঙ্গন।
ভাষা, লেখা ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা
প্রযুক্তির যুগে তথ্যের অভাব হবে না। বরং তথ্যের পরিমাণ এত বেশি হবে যে, সঠিক তথ্য বাছাই করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে একজন আইনজীবীর writing skill এবং analytical ability আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভালো আইনজীবী তিনি নন, যিনি সবচেয়ে বেশি কথা বলেন। ভালো আইনজীবী তিনি, যিনি অল্প কথায় বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারেন।
আইনজীবীর ভাষা হতে হবে সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং যুক্তিনির্ভর। অপ্রয়োজনীয় অলংকার বা জটিল শব্দ দিয়ে argument ভারী করার কোনো প্রয়োজন নেই। একটি শক্তিশালী যুক্তি নিজেই যথেষ্ট শক্তিশালী।
বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় পরিষ্কারভাবে লিখতে ও বলতে পারার দক্ষতা একজন তরুণ আইনজীবীকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে।
শেষ কথা: প্রযুক্তি শিখুন, কিন্তু আইনকে ভুলে নয়
প্রিয় তরুণ আইন শিক্ষার্থীরা,
তোমরা এমন একটি সময়ে আইন পেশায় প্রবেশ করতে যাচ্ছ, যখন পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তোমাদের সামনে আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি। তোমরা প্রযুক্তি শিখবে। AI ব্যবহার করবে। Online legal research করবে। Digital tools ব্যবহার করবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই shortcut-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে না।
আইনের বই পড়বে। সংবিধান পড়বে। রায় পড়বে। আইনজীবীদের argument শুনবে। আদালতে বসবে। নিজের হাতে নোট করবে। নিজের যুক্তি তৈরি করবে। ভুল করবে এবং সেই ভুল থেকে শিখবে।
মনে রাখবে, একজন আইনজীবীর প্রকৃত শক্তি তার laptop, software কিংবা AI tool-এ নয়; তার প্রকৃত শক্তি তার আইনজ্ঞান, যুক্তিবোধ, সততা, সাহস এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারে। প্রযুক্তি তোমার হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু তোমার বিবেকের বিকল্প নয়।
আগামী দিনের আইনজীবী সেই ব্যক্তি, যিনি এক হাতে আইনগ্রন্থ এবং অন্য হাতে প্রযুক্তিকে ধারণ করবেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিবেক দিয়ে। কারণ শেষ পর্যন্ত আদালতে বিচার হয় প্রযুক্তির নয়, আইন ও যুক্তির। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের জন্য।
সেই মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করাই একজন আইনজীবীর সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।র সমাধানে আইনি পরামর্শ কি ভাবে পাওয়া যায়।